সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের সদ্য সই হওয়া ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি ইরানকে লক্ষ্য করে করা হয়নি বলে জানিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। তাঁর দাবি, চুক্তিতে ইরান বা অন্য কোনো দেশকে অভিন্ন হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। তবে চুক্তি নিয়ে ইরানের কর্মকর্তারা আপত্তি জানিয়ে সৌদি আরবকে নতুন মিত্রদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করার সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
শুক্রবার সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে স্বাক্ষর করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
শনিবার তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সিকে হাকান ফিদান বলেন, চুক্তিতে কোনো অভিন্ন হুমকির কথা লিখিতভাবে উল্লেখ করা হয়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিন দেশের কোনো একটির ওপর হামলা না করা কোনো দেশকে এই চুক্তির আওতায় লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে না।
হাকান ফিদানের ভাষ্য অনুযায়ী, কারিগরি দিক থেকে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিটি ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর সঙ্গে তুলনীয়। ন্যাটোর এই ধারায় কোনো সদস্যদেশের ওপর হামলাকে জোটের সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তবে মক্কা চুক্তিতে আক্রান্ত দেশকে কী ধরনের সামরিক সহায়তা দেওয়া হবে, তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। কোনো দেশ আক্রান্ত হলে প্রথমে তাকে সহযোগিতার অনুরোধ জানাতে হবে এবং কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, তা নির্দিষ্ট করতে হবে।
সহায়তার আওতা গোয়েন্দা তথ্য ও রসদ সরবরাহ থেকে শুরু করে গোলাবারুদ কিংবা সামরিক ইউনিট মোতায়েন পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
চুক্তির আওতায় রাজনৈতিক ও সামরিক কমিটি গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কমিটিতে তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সামরিক বাহিনীর প্রধানেরা থাকবেন। সৌদি আরবে একটি সচিবালয় স্থাপনের কথাও রয়েছে।
ফিদান জানান, তিন দেশ যৌথ প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, রসদ সরবরাহ, হুমকি মূল্যায়ন এবং সামরিক সক্ষমতার সমন্বয়ের মতো বিষয়ে সহযোগিতা করবে। প্রতিরক্ষা শিল্পে পারস্পরিক সহযোগিতাও চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মক্কায় তিন নেতার বৈঠকে সামরিক প্রযুক্তির পারস্পরিক ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, চুক্তিটি তৈরির প্রস্তুতি চলেছে প্রায় দুই বছর আট মাস ধরে। ফলে বর্তমান ইরানকেন্দ্রিক উত্তেজনার কারণে এটি হঠাৎ করে করা হয়নি বলে তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
তুরস্কের পক্ষ থেকে ইরানকে লক্ষ্য না করার আশ্বাস দেওয়া হলেও ইরানের কয়েকজন কর্মকর্তা চুক্তিটির সমালোচনা করেছেন। একই সঙ্গে সৌদি আরবকে নিরাপত্তার জন্য নতুন মিত্রদের ওপর নির্ভর না করার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক কমিটির সদস্য মাহমুদ নাবাবিয়ান বলেন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতা সৌদি আরবের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারবে না। বিষয়টি সৌদি নেতৃত্বকে উপলব্ধি করতে হবে।
একই কমিটির সদস্য ইব্রাহিম রেজায়ি চুক্তিটিকে অবাস্তব এবং ‘কাগুজে চুক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সরাসরি মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির নাম উল্লেখ করেননি। তবে তিনি আঞ্চলিক দেশগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নিজেদের ওপর নির্ভর করার আহ্বান জানান। তিনি এটিকে ‘প্রকৃত ভ্রাতৃত্ব’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
এর পাশাপাশি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা ও প্রস্তুতির কথাও জোর দিয়ে তুলে ধরেন আরাগচি।
হাকান ফিদানের বক্তব্যে মক্কা চুক্তিকে আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদের হাতে নেওয়ার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
আনাদোলুকে দেওয়া বক্তব্যে ফিদান বলেন, বাইরের কোনো শক্তি এসে কোনো অঞ্চলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করলে সমস্যার সমাধান না হয়ে বরং তা আরও জটিল হয়।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের চিন্তা অনুযায়ী উদ্যোগটি শুধু তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হবে না। প্রয়োজন অনুযায়ী এর পরিধি বাড়িয়ে আরও দেশকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
ফিদান তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানকে উদ্যোগটির ‘মূল দেশ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যে কয়েকটি দেশ এ উদ্যোগে আগ্রহ দেখিয়েছে।
সম্ভাব্য অংশীদারদের মধ্যে মিসরের নামও উল্লেখ করেছেন তিনি। দেশটিকে ‘স্বাভাবিক অংশীদার’ হিসেবে বর্ণনা করে ফিদান বলেন, মিসরও ভবিষ্যতে এতে যোগ দিতে পারে। তবে তার আগে কিছু কারিগরি বিষয় নিষ্পত্তি করতে হবে।
নতুন চুক্তির বাস্তব প্রয়োগের বেশ কিছু দিক এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। বিশেষ করে কোনো সংকট দেখা দিলে তিন দেশের সামরিক বাহিনী কীভাবে সমন্বিতভাবে কাজ করবে, সে বিষয়ে আরও সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
তবে যৌথ রাজনৈতিক ও সামরিক কমিটি, স্থায়ী সচিবালয়, সামরিক সক্ষমতার সমন্বয় এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতার পরিকল্পনা থেকে বোঝা যায়, উদ্যোগটি কেবল পারস্পরিক প্রতিরক্ষার প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা নেই। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে তিন দেশের মধ্যে আরও বিস্তৃত সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতার কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
