মিয়ানমারের দক্ষিণাঞ্চলে দাওয়েই গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পে রাশিয়ার যুক্ত হওয়ার উদ্যোগ বঙ্গোপসাগর ও আশপাশের অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করছে। চীন ও ভারতের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও যোগাযোগ প্রকল্পের পর এবার একই অঞ্চলে রাশিয়ার সম্ভাব্য উপস্থিতি আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কৌশলগত হিসাব আরও জটিল করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থান ও পরবর্তী গৃহযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিকভাবে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন মিয়ানমারের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হয়ে উঠেছে রাশিয়া। মস্কোর কাছ থেকে কূটনৈতিক সমর্থন, সামরিক সরঞ্জাম এবং জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সহায়তা পেয়ে আসছে দেশটি।
মিয়ানমারের রাখাইন উপকূলে চীন-সমর্থিত কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প রয়েছে। একই রাজ্যে ভারতের অর্থায়নে সিত্তে সমুদ্রবন্দর ও কালাদান বহুমুখী পরিবহন করিডোর গড়ে উঠেছে। এর বাইরে দেশের দক্ষিণে আন্দামান সাগর উপকূলে অবস্থিত দাওয়েই গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পে এবার রাশিয়া যুক্ত হচ্ছে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দাওয়েই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ সহযোগিতা নিয়ে মিয়ানমার ও রাশিয়া সমঝোতা স্মারক সই করে। এতে সমুদ্রবন্দর ও তেল শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনাও ছিল।
গত ১৮ আগস্ট মস্কো সফরে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে দাওয়েই প্রকল্প নিয়ে আবার আলোচনা করেন মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং। পরে রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মিখাইল মিশুস্তিন জানান, রুশ কোম্পানিগুলো দাওয়েই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে কাজ করতে আগ্রহী। এর মাধ্যমে বাণিজ্য বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
দাওয়েই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের পরিকল্পনা অবশ্য নতুন নয়। মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড ২০০৮ সালে এ অঞ্চল নির্মাণে সমঝোতা স্মারক সই করেছিল।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, দাওয়েইয়ের মাধ্যমে থাইল্যান্ডের পাশাপাশি কম্বোডিয়ার নমপেন ও ভিয়েতনামের হো চি মিন সিটির উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে স্থলপথে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করার কথা ছিল। এতে পণ্য পরিবহনে মালাক্কা প্রণালি ঘুরে যাওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে ভারত, দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বাজারে পণ্য পাঠাতেও সময় সাশ্রয়ের সম্ভাবনা ছিল।
তবে অর্থায়ন, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও অংশীদারদের মতবিরোধের কারণে প্রকল্পটি দীর্ঘদিন এগোয়নি। থাই নেতৃত্বাধীন বেসরকারি কনসোর্টিয়ামের উন্নয়ন ছাড়পত্র ২০২০ সালে বাতিল করা হয়। দীর্ঘ স্থবিরতার পর মিয়ানমার এখন প্রকল্পটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় বড় অংশীদার হিসেবে সামনে এসেছে রাশিয়া।
দাওয়েই সরাসরি বঙ্গোপসাগরের তীরে নয়, আন্দামান সাগরের উপকূলে। তবে বঙ্গোপসাগর, আন্দামান সাগর, ভারত মহাসাগর ও মালাক্কা প্রণালি একই বৃহত্তর নৌ-বাণিজ্য ও নিরাপত্তা অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক আইএসইএএস ইউসুফ ইসহাক ইনস্টিটিউটের প্রিন্সিপাল ফেলো ইয়ান স্টোরির মতে, দাওয়েই রাশিয়াকে আন্দামান সাগর হয়ে ভারত মহাসাগর ও মালাক্কা প্রণালিতে প্রবেশের সুযোগ দিতে পারে। রুশ সাবমেরিনের যাত্রাবিরতির স্থান হিসেবেও বন্দরটি ব্যবহৃত হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তার মতে, দাওয়েই কেবল শিল্প ও পরিবহন প্রকল্প হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ভারত মহাসাগরে রাশিয়ার প্রভাব বাড়ানোর অবকাঠামো হিসেবেও এটি বিবেচিত হতে পারে।
সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। রাশিয়া দেশটিকে যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও ড্রোনসহ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করছে। নেপিদোয় পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে মস্কো।
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, গৃহযুদ্ধ ও প্রতিকূল ব্যবসায়িক পরিবেশের কারণে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মিয়ানমারে বিদেশী বিনিয়োগ ৭৪ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে নতুন বিদেশী বিনিয়োগের প্রায় অর্ধেক এসেছে চীনা বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে।
এ অবস্থায় দাওয়েইয়ে রাশিয়াকে যুক্ত করার উদ্যোগকে চীনের ওপর মিয়ানমারের অর্থনৈতিক নির্ভরতা কিছুটা ভারসাম্য করার প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
মিয়ানমারে চীনের কৌশলগত উপস্থিতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর। রাখাইন রাজ্যের বঙ্গোপসাগর উপকূলে প্রস্তাবিত এ বন্দর চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের কেন্দ্রীয় প্রকল্প।
পরিকল্পিত যৌথ উদ্যোগে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সিটিক গ্রুপের নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়ামের অংশীদারত্ব ৭০ শতাংশ এবং মিয়ানমারের ৩০ শতাংশ। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭৩০ কোটি ডলার। পরে ঋণঝুঁকির কারণে তা কমানো হয়।
কিয়াকফিউতে চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং পর্যন্ত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের পাইপলাইনের প্রান্তিক কেন্দ্র রয়েছে। গভীর সমুদ্রবন্দরটি চালু হলে বঙ্গোপসাগর থেকে মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পণ্য পরিবহনের সরাসরি পথ তৈরি হতে পারে।
কিয়াকফিউয়ের কাছেই রাখাইনের রাজধানী সিত্তেতে ভারত নির্মাণ করেছে আরেকটি বন্দর। এটি কালাদান বহুমুখী পরিবহন প্রকল্পের অংশ। ২০২৩ সালের মে মাসে সিত্তে বন্দর চালু হয়।
প্রকল্পটির লক্ষ্য কলকাতা থেকে সমুদ্রপথে সিত্তে, এরপর কালাদান নদীপথে পালেতওয়া হয়ে সড়কপথে ভারতের মিজোরামের জোরিনপুই পর্যন্ত যোগাযোগ স্থাপন করা। এর মাধ্যমে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে শিলিগুড়ি করিডোরের ওপর নির্ভরতা কমানোর বিকল্প পথ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে প্রকল্পের নদী ও সড়ক অংশের উল্লেখযোগ্য এলাকা আরাকান আর্মি-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে পড়েছে। ফলে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে ভারতের জন্য নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
দাওয়েইয়ে রাশিয়ার সম্ভাব্য উপস্থিতি ভারত ও চীনের জন্যও নতুন কৌশলগত প্রশ্ন তৈরি করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের মত।
ভারত ও রাশিয়ার দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি সম্পর্ক রয়েছে। তবে আন্দামান সাগর ও ভারত মহাসাগরের নিরাপত্তা ভারতের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের অংশ। ফলে নিজেদের কৌশলগত পরিসরে রাশিয়ার স্থায়ী নৌ-উপস্থিতি নয়াদিল্লির জন্য অস্বস্তির কারণ হতে পারে।
অন্যদিকে চীনও আন্দামান সাগরে অন্য একটি পরাশক্তির দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতিকে পুরোপুরি স্বস্তির সঙ্গে দেখবে—এমনটা নিশ্চিত নয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রাশিয়ার প্রভাব বাড়লে বেইজিংয়ের কৌশলগত হিসাবেও পরিবর্তন আসতে পারে।
থাইল্যান্ডভিত্তিক নাগরিক সংগঠন ইটিওস ওয়াচ কোয়ালিশনের সমন্বয়ক তিরাচাই সানজারোয়েনকিজথাওর্নের মতে, মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ চীনের প্রভাবের ভারসাম্য তৈরির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে দেশটি এখনো বড় বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত—এমন বার্তাও দিতে চাইছে।
তিনটি প্রকল্পের ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধ। কিয়াকফিউ ও সিত্তে-কালাদান করিডোরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ রাখাইনে, যেখানে সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাত চলছে।
অন্যদিকে দাওয়েই ও থাইল্যান্ডমুখী সড়কের কিছু অংশও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এলাকার মধ্য দিয়ে যাবে। ফলে এসব অবকাঠামো প্রকল্পের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে শুধু জান্তা সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক যথেষ্ট নাও হতে পারে; সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও সমঝোতার প্রয়োজন হতে পারে।
চীন ইতিমধ্যে মিয়ানমারের বিভিন্ন রাজ্যের সংঘাতে জান্তা ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করেছে।
সব মিলিয়ে কিয়াকফিউয়ে চীনের, সিত্তে-কালাদান করিডোরে ভারতের এবং দাওয়েইয়ে রাশিয়ার সম্ভাব্য উপস্থিতি মিয়ানমারের উপকূলীয় অঞ্চলকে পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র করে তুলছে। এ কারণে বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর ঘিরে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি আরও বহুমাত্রিক ও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
