গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে স্বামীর নির্যাতনের অভিযোগের মধ্যে ২০ বছর বয়সী আল মাইদা আক্তারের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর দুই দিন আগে মারধরে আহত হওয়ার ছবি খালাতো বোনের কাছে পাঠিয়ে মাইদা বলেছিলেন, ‘আপা, ও আমাকে আজও মারছে।’
হাসপাতালে নেওয়ার পর মাইদাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। এ সময় তাঁর স্বামী মো. সিয়াম আল মুরসালিন আকাশ হাসপাতাল থেকে পালিয়ে গেলে স্থানীয় লোকজন তাঁকে আটক করে পুলিশের কাছে দেন। মাইদার পরিবারের অভিযোগ, তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় তাঁর মা পলাশবাড়ী থানায় মামলা করেছেন।
সিয়ামের বাড়ি গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের শালমারা গ্রামে। মাইদার মায়ের বাড়ি সাদুল্লাপুর উপজেলার ইদিলপুরে। প্রেমের সম্পর্কের পর ২০২১ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। তাঁদের চার ও এক বছর বয়সী দুটি ছেলে রয়েছে।
মাইদা পলাশবাড়ী সরকারি কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। দুই ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ছোট। তাঁর বাবা শাহাজাদা মিয়া মারা যাওয়ার পর মা মোছা. রহিমা খাতুন ভূমি অফিসে দলিল লেখার কাজ করে দুই সন্তানকে বড় করেন।
মাইদার মা জানান, বিয়ের পর থেকেই তাঁর মেয়েকে মারধর করতেন সিয়াম। এ নিয়ে একবার সালিসও হয়েছিল। তখন সিয়াম বিষয়টিকে স্বামী-স্ত্রীর পারিবারিক সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
মাইদার খালাতো বোন মোসাম্মৎ শাফিয়া জানান, স্বামীর মারধরের কথা মাইদা তাঁকে প্রায়ই বলতেন। মৃত্যুর দুই দিন আগে মাইদা তাঁর মুখের আঘাতের ছবি পাঠান। ছবিতে চোখ ফোলা ও গালের এক পাশে ব্যান্ডেজ দেখা যায়। সংসার ছেড়ে চলে আসার পরামর্শ দিলে মাইদা সন্তানদের কথা উল্লেখ করে সেখানে থাকার কারণ জানিয়েছিলেন।
পলাশবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সারওয়ার আলম খান জানান, মাইদার গলায় দাগ এবং পুরোনো আঘাতের কিছু চিহ্ন ছিল। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে।
পুলিশের কাছে সিয়াম বলেছেন, বিকেলে তাঁদের মধ্যে মারপিট হয়। পরে মাইদা ফ্যানের সঙ্গে ফাঁস দেন। তাঁর বন্ধুরা অচেতন অবস্থায় তাঁকে নামিয়ে আনেন এবং পরে সিয়াম তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নারী নির্যাতনসংক্রান্ত মোট ২৭ হাজার ৯১১টি কল এসেছে। এর মধ্যে স্বামীর হাতে নির্যাতনের অভিযোগ ছিল ১৭ হাজার ১৯৬টি, যা মোট অভিযোগের প্রায় ৬২ শতাংশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জীবনসঙ্গী বা স্বামীর হাতে প্রায় ৭০ শতাংশ নারী জীবদ্দশায় অন্তত একবার শারীরিক, যৌন, মানসিক ও অর্থনৈতিক সহিংসতা বা নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন।
নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, পারিবারিক সহিংসতাকে অপরাধ হিসেবে না দেখে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতির কারণে এ ধরনের নির্যাতন প্রতিরোধ কঠিন হচ্ছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম ভুক্তভোগীদের বিচার পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং নারী নির্যাতনের মামলা নিয়ে অপপ্রচার বন্ধের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
এদিকে পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট ‘আমরাই পারি’র প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক বলেছেন, শুধু আইন পরিবর্তন বা সংস্কারের মাধ্যমে পারিবারিক সহিংসতা বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, মানুষের আচরণগত পরিবর্তনের পাশাপাশি বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা কাটিয়ে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ নীতি নিয়ে এগোতে হবে।
