ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার কথা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রেসিডেন্টের একতরফা ঘোষণায় কোনো ভূখণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হয়ে যায় না। ফলে ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা কার্যকর করা সম্ভব, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।
আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
গত শুক্রবার নিউইয়র্কের একটি পুলিশ একাডেমিতে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প বলেন, ইরানকে পরাজিত করার পর খুব শিগগির হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করবেন তিনি। একই সঙ্গে তাঁর দাবি, সেখানে মার্কিন নৌ অবরোধ কার্যকর রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ এই প্রণালি ব্যবহার করতে পারবে না।
তবে ট্রাম্পের বক্তব্য সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। দেশটির কর্মকর্তারা এটিকে ‘অর্থহীন’ বলে মন্তব্য করেছেন। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি বলেন, হরমুজ প্রণালি ইরানের ছিল, আছে এবং থাকবে। প্রণালিটি কখন খুলবে বা বন্ধ থাকবে, সেই সিদ্ধান্ত ইরানই নেবে বলেও দাবি করেন তিনি।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যেও আলোচনা চলছে। প্রণালিটির অপর উপকূলীয় দেশ ওমান।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, দুই দেশের আলোচনা শিগগির শেষ হতে পারে। তবে প্রণালিটি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়টি আলাদা বলে জানিয়েছেন তিনি।
আরাগচির বক্তব্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক নৌ চলাচল ফিরিয়ে আনতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে গত জুনে করা সমঝোতা স্মারকের কিছু শর্ত মানতে হবে। এর মধ্যে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয় রয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করতে প্রেসিডেন্টের একক ঘোষণা যথেষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সহকারী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্রুস ফেইনের মতে, মার্কিন সংবিধান প্রেসিডেন্টকে এককভাবে কোনো ভূখণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্ত করার ক্ষমতা দেয় না। এ ধরনের পদক্ষেপের জন্য সিনেটের অনুমোদিত চুক্তি অথবা কংগ্রেসের আইন প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসেও ভূখণ্ড অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। লুইজিয়ানা ক্রয়, হাওয়াই ও পানামা খালের অধিগ্রহণ এবং স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধের পর পুয়ের্তো রিকো ও ফিলিপাইনের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রক্রিয়া দেখা গেছে।
ফেইন সতর্ক করে বলেন, সামরিক শক্তি ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি দখল বা সেটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে পরিণত করার চেষ্টা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ নাটালি ক্লেইনের মতে, আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে হরমুজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হলে সেখানে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর জন্য ইরান বা অন্তত দেশটির উপকূলীয় অঞ্চলের ওপর সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন হতে পারে।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, পুরো হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের একক সার্বভৌমত্ব নেই। প্রণালির দুই পাশে রয়েছে ইরান ও ওমান।
জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশন অনুযায়ী, উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলো তাদের উপকূল থেকে সর্বোচ্চ ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত আঞ্চলিক জলসীমার ওপর সার্বভৌম অধিকার ভোগ করে। তবে আন্তর্জাতিক প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট অধিকারও রয়েছে।
হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ প্রায় ২১ নটিক্যাল মাইল বা ৩৯ কিলোমিটার। ফলে সেখানে ইরান ও ওমানের ১২ নটিক্যাল মাইল করে আঞ্চলিক জলসীমা পরস্পরের সঙ্গে মিলে যায়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কেউই জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশন আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেনি। তবে সমুদ্রপথ ও আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলসংক্রান্ত কনভেনশনের অনেক বিধান আন্তর্জাতিক রীতিনীতির অংশ হিসেবে স্বীকৃত।
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও অসন্তোষের খবর পাওয়া যাচ্ছে। রয়টার্স ও ইপসোসের এক জরিপে মাত্র ৩৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক যুদ্ধটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
দীর্ঘ সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত কমে আসার কথাও বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। এর মধ্যে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টরও রয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে জ্বালানি বাজারে। যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের গড় দাম প্রতি গ্যালন ৪ ডলারের ওপরে উঠেছে, যা মার্কিন নাগরিকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গত সপ্তাহে জানান, যুদ্ধের মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার এখন পেট্রোলের দাম নিয়ন্ত্রণ করা। ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা তাদের দ্বিতীয় অগ্রাধিকার বলে উল্লেখ করেন তিনি।
কাতারের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ মনে করেন, ট্রাম্পের বক্তব্যের একটি বড় অংশ তাঁর রাজনৈতিক সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া। তাঁর মতে, ট্রাম্প একজন ‘শোম্যান’ হিসেবে পরিচিত হওয়ায় তাঁর সব বক্তব্য আক্ষরিক অর্থে নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
তবে হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে পরিণত করার ধারণাকে বাস্তবসম্মত মনে করেন না মাসগ্রেভ। তাঁর মতে, আইনগত ও বাস্তব—দুই দিক থেকেই এমন পদক্ষেপ কার্যত অসম্ভব। তবে ট্রাম্পের বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলছে, দীর্ঘ সংঘাতের পরও যুক্তরাষ্ট্র এখনই ইরানের কাছে পরাজয় মেনে পিছু হটার অবস্থানে নেই।
