বন্দী সাবেক নেত্রীর বিষয়ে আশ্বস্ত করল জান্তা সরকার, সাক্ষাতের সুযোগ চাইল আসিয়ানের সদস্যরা
মিয়ানমারের সাবেক রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা ও নোবেলজয়ী নেতা অং সান সু চি সুস্থ আছেন বলে দাবি করেছে দেশটির সামরিক সরকারের প্রতিনিধিরা। দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিন মং সোয়ে জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে বন্দী থাকা সু চির দেখভালের দায়িত্ব সরকারই পালন করছে।
রোববার অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সু চিকে ‘পরিবারের সদস্য’ ও ‘বোন’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তাঁর নিরাপত্তা ও সুস্থতার বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। বৈঠকের পর আসিয়ানের বিশেষ দূত এবং কয়েকজন সদস্য দেশের কূটনীতিক এ তথ্য জানান।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকেই তিনি বিভিন্ন মামলায় দণ্ডিত হয়ে বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক মহল বারবার তাঁর অবস্থান, স্বাস্থ্য এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও জান্তা সরকার এ বিষয়ে সীমিত তথ্য প্রকাশ করেছে।
ফিলিপাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া তেরেসা লাজারো জানান, দীর্ঘদিন ধরে তিনি সু চির সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি চেয়ে আসছেন। সাম্প্রতিক বৈঠকে মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে তিনি ধারণা পেয়েছেন যে সু চি শারীরিকভাবে সুস্থ আছেন।
তবে তিনি বলেন, শুধু সরকারি বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন, যাতে বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করা সম্ভব হয়।
২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর এই প্রথমবারের মতো আসিয়ানের শীর্ষ কূটনীতিকরা মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে বসেন। আঞ্চলিক শান্তি প্রচেষ্টা পুনরুজ্জীবিত করা এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রম জোরদারের লক্ষ্যে এ বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যদিও গত কয়েক বছরে আসিয়ানের মধ্যস্থতায় নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ এখনো দেশটির সংঘাত নিরসনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। মিয়ানমারে চলমান সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মানবিক সংকটের কারণে লাখো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বর্তমানে অং সান সু চি একাধিক মামলায় মোট ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। সম্প্রতি জান্তা সরকার তাঁর সাজা আংশিক কমিয়েছে। তবে সু চির রাজনৈতিক সহযোগীরা দাবি করে আসছেন, এসব মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তাঁকে সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে রাখার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
সু চি নিজেও তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো অস্বীকার করে আসছেন। এছাড়া তাঁকে বর্তমানে কোথায় রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে সরকারিভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
মিয়ানমারের রাজনৈতিক সংকট সমাধানে আসিয়ান আগে একটি পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছিল। এতে সহিংসতা বন্ধ, সংলাপ শুরু এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।
কিন্তু পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় আসিয়ানের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকগুলো থেকে মিয়ানমারের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বকে কার্যত দূরে রাখা হয়। ফলে আঞ্চলিক কূটনৈতিক সম্পর্কেও এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়।
থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিহাসাক ফুয়াংকেতকে জানিয়েছেন, আসিয়ানের সদস্য দেশগুলো সু চির সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ পাওয়ার বিষয়টি মিয়ানমারের কাছে গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করেছে।
তাঁর মতে, সু চি সুস্থ আছেন—এমন সরকারি দাবির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের সাক্ষাৎ করার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। এতে আস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং শান্তি প্রক্রিয়াও এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে।
অং সান সু চির স্বাস্থ্য ও অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের মধ্যেই মিয়ানমারের সামরিক সরকার তাঁকে সুস্থ বলে দাবি করেছে। তবে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো মনে করছে, কেবল মৌখিক আশ্বাস যথেষ্ট নয়; সু চির সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ নিশ্চিত করা হলে তাঁর প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে এটি মিয়ানমারের রাজনৈতিক সংকট সমাধানে আঞ্চলিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকেও নতুন গতি দিতে পারে।
