ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে সাম্প্রতিক ক্ষয়ক্ষতির নতুন প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে আল জাজিরা। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৭ থেকে ১২ জুলাইয়ের মধ্যে কেন্দ্রটির অভ্যন্তরে নতুন আঘাতের চিহ্ন তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পুনরায় উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এসব হামলা সংঘটিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউরোপীয় সেন্টিনেল-২ স্যাটেলাইটের ৭ জুলাই ও ১২ জুলাই ধারণ করা ছবির তুলনামূলক বিশ্লেষণে বুশেহর কমপ্লেক্সের ভেতরে নতুন আঘাতের চিহ্ন এবং নিকটবর্তী সহায়ক স্থাপনায় আরও একটি সম্ভাব্য হামলার স্থান শনাক্ত করা হয়েছে।
আল জাজিরা নেটওয়ার্কের ওপেন-সোর্স অনুসন্ধান ইউনিট স্যাটেলাইট ছবি, মাঠপর্যায়ের ভিডিও এবং মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)-এর তথ্য ব্যবহার করে ৭ থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত ইরানে পরিচালিত মার্কিন হামলার বিভিন্ন স্থান চিহ্নিত করেছে।
বুশেহর প্রদেশের উপ-গভর্নর এহসান জাহানিয়ান ৯ জুলাই জানিয়েছিলেন, প্রদেশের একাধিক স্থানে হামলা হয়েছে। এর মধ্যে বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশের এলাকা, চোগাদাকের একটি সামরিক স্থাপনা এবং প্রদেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটি মাছ ধরার বন্দরও ছিল। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা তার এ বক্তব্য প্রকাশ করে।
তবে পরে জাহানিয়ান পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরাসরি হামলার খবর অস্বীকার করে বলেন, রিঅ্যাক্টর অক্ষত রয়েছে এবং স্বাভাবিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এ হামলাগুলো ছিল ইরানের বিরুদ্ধে বৃহত্তর মার্কিন সামরিক অভিযানের অংশ। সেন্টকম জানিয়েছে, ৭ ও ৮ জুলাই তারা প্রায় ৯০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার, নৌবাহিনীর সম্পদ এবং দক্ষিণ উপকূলীয় সামরিক অবকাঠামো।
তবে মার্কিন কর্তৃপক্ষ ঘোষিত লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় বুশেহর বা অন্য কোনো পারমাণবিক স্থাপনার নাম উল্লেখ করেনি।
বুশেহর বর্তমানে ইরানের একমাত্র কার্যকর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। বুশেহর শহর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত ২ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই কমপ্লেক্সে রয়েছে রিঅ্যাক্টর ভবন, সমুদ্রের সঙ্গে সংযুক্ত কুলিং ওয়াটার চ্যানেল, অ্যাসেম্বলি হল এবং নির্মাণ ও পরিচালনাসংক্রান্ত সরঞ্জাম গ্রহণের জন্য একটি বন্দর।
কেন্দ্রটিতে দুটি রিঅ্যাক্টর ভবন রয়েছে। এর মধ্যে একটি চালু থাকলেও অন্যটি দীর্ঘদিন ধরে অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পাওয়ার রিঅ্যাক্টর ইনফরমেশন সিস্টেম (পিআরআইএস) অনুযায়ী, বুশেহর-১ রিঅ্যাক্টরের নিট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৯১৫ মেগাওয়াট।
রিঅ্যাক্টরটি ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত হয় এবং ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে।
নাতাঞ্জ বা ফোরদোর মতো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের তুলনায় বুশেহর বিদ্যুৎকেন্দ্রের গুরুত্ব ভিন্ন। এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পারমাণবিক জ্বালানি ও তেজস্ক্রিয় উপাদান ব্যবহৃত হয়। ফলে কুলিং সিস্টেম, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা বা সুরক্ষা কাঠামোর কোনো ক্ষতি হলে তার প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি সংবেদনশীল হতে পারে।
২০২৬ সালে বুশেহর কেন্দ্রের আশপাশে এটি প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রজেক্টাইল-সংক্রান্ত ঘটনা নয়।
আইএইএর কাছে ইরানের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার জমা দেওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৭ মার্চ, ২৪ মার্চ ও ২৭ মার্চ কেন্দ্রটির ভেতরে একাধিক প্রজেক্টাইল আঘাত হানে। এছাড়া ৪ এপ্রিল প্রথম ইউনিটের রিঅ্যাক্টর ঘিরে থাকা বেড়ার কাছে আরেকটি আঘাতের ঘটনা ঘটে।
প্রতিটি ঘটনার পর ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, রিঅ্যাক্টর স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং মূল রিঅ্যাক্টরের কোনো ক্ষয়ক্ষতি রেকর্ড করা হয়নি।
পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার ঝুঁকি নিয়ে আইএইএ বারবার সতর্কতা দিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, সম্ভাব্য মানবিক, পরিবেশগত ও আঞ্চলিক পারমাণবিক নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে পারমাণবিক স্থাপনাগুলো কখনোই সশস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া উচিত নয়।
