২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ১৬ বছর পর আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে স্পেন। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে বল দখল, উচ্চমানের প্রেসিং এবং সুসংগঠিত দলগত ফুটবলের প্রদর্শন করে শিরোপা জিতেছে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ের একমাত্র গোলে জয় নিশ্চিত করেন ফেরান তোরেস।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে স্পেনের ধারাবাহিক পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। একই কৌশলে প্রতিপক্ষকে চাপে রেখে এবং ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে ধরে রেখে তারা পরপর তিনটি ম্যাচে জয় তুলে নেয়। শুধু ফলাফল দেখে তাদের আধিপত্যের মাত্রা বোঝা কঠিন হলেও পরিসংখ্যান সেই চিত্র স্পষ্ট করে।
পুরো টুর্নামেন্টে আট ম্যাচে স্পেনের বিপক্ষে প্রতিপক্ষরা মিলিয়ে মাত্র ২.২ এক্সপেক্টেড গোল (এক্সজি) তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিপক্ষ দলগুলো কার্যত বড় কোনো গোলের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেনি। রক্ষণাত্মক দৃঢ়তা ও কৌশলগত শৃঙ্খলার এমন উদাহরণ আন্তর্জাতিক ফুটবলে বিরল বলেই বিবেচিত হচ্ছে।
নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত ফাইনালেও সেই ধারা অব্যাহত ছিল। লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা ১২০ মিনিটের ম্যাচে স্পেনের গোলমুখে একটি শটও রাখতে পারেনি। মাঝমাঠ ও রক্ষণে নির্ভুল প্রেসিংয়ের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে দেয় স্প্যানিশরা। বলের দখল, আক্রমণ পরিচালনা এবং গোলের সম্ভাবনা তৈরির ক্ষেত্রেও এগিয়ে ছিল তারা।
তবে স্পেনের জয় নির্ধারিত সময়ে নিশ্চিত হতে পারেনি মূলত আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজের দুর্দান্ত কয়েকটি সেভের কারণে। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের করা গোলই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেয়। সেই গোলের সুবাদে ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি নিজেদের করে নেয় স্পেন।
২০১০ সালের বিশ্বকাপ জয়ের সঙ্গে এবারের অভিযানের বেশ কিছু মিলও দেখা গেছে। সেবার সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে হার দিয়ে শুরু করলেও এবার কেপ ভার্দের সঙ্গে ড্র করে যাত্রা শুরু করে তারা। তবে শুরুতে হোঁচট খেলেও পরবর্তীতে আর পিছনে তাকাতে হয়নি স্প্যানিশদের।
টুর্নামেন্টের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে দলটি আরও পরিণত ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। সেমিফাইনালে অন্যতম শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রান্সকে নিয়ন্ত্রণে রেখে জয় তুলে নেয় তারা। এই সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন প্রধান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। ২০২৪ ইউরো জয়ের পর বিশ্বমঞ্চেও তিনি দলকে চাপমুক্ত ও সুসংগঠিত রাখতে সক্ষম হন।
ফাইনালে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়ার পর সংখ্যাগত সুবিধা আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগায় স্পেন। বদলি হিসেবে নেমে নিকো উইলিয়ামস আক্রমণে নতুন গতি যোগ করেন, যার ধারাবাহিকতায় আসে জয়সূচক গোল।
মাঝমাঠে স্পেনের সবচেয়ে প্রভাবশালী খেলোয়াড় ছিলেন রদ্রি। ২০২৫ সালের গুরুতর হাঁটুর চোট কাটিয়ে ফিরে এসে তিনি পুরো টুর্নামেন্টে অসাধারণ পারফরম্যান্স উপহার দেন। বল পুনরুদ্ধার, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রমণ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল অনন্য। প্রতিপক্ষরা তাঁকে থামাতে অনেক সময় একাধিক খেলোয়াড়ের সহায়তা নিতে বাধ্য হয়েছে।
টুর্নামেন্টজুড়ে ধারাবাহিক নৈপুণ্যের স্বীকৃতি হিসেবে রদ্রির হাতে ওঠে বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার ‘গোল্ডেন বল’।
তবে স্পেনের সাফল্যের মূল ভিত্তি ছিল দলগত সমন্বয়। কিলিয়ান এমবাপ্পে, লিওনেল মেসি, জুড বেলিংহাম বা আর্লিং হলান্ডের মতো তারকানির্ভর দলগুলোর বিপরীতে স্পেন নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে একটি সমন্বিত ইউনিট হিসেবে। শৃঙ্খলা, কৌশলগত দক্ষতা এবং সামষ্টিক ফুটবলের শক্তিতেই তারা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা জিতেছে।
নিউ জার্সির ফাইনালে স্পেনের পারফরম্যান্স ছিল এমনই প্রভাবশালী যে তাদের হাতে ট্রফি ওঠাই ছিল ম্যাচের স্বাভাবিক পরিণতি। আক্রমণাত্মক, ইতিবাচক ও দর্শনীয় ফুটবলের পুরস্কার হিসেবেই বিশ্বকাপের মুকুট এবার শোভা পেল স্পেনের মাথায়।
