যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ভাষণে দেশবাসীর জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। তিনি বলেছেন, আগামী ১০ বছরের জন্য একটি জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে এবং মঙ্গলবার থেকেই ব্যয় সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগের বিস্তারিত ঘোষণা শুরু হবে।
ডাউনিং স্ট্রিটের বাইরে দেওয়া ভাষণে বার্নহ্যাম বলেন, “আমাদের আরও ভালো হতে হবে” এবং “এই মুহূর্তটি ব্রিটেনের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট হবে।” তিনি দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় গত ৪০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের অঙ্গীকারও করেন।
নতুন প্রধানমন্ত্রী জানান, ওয়েস্টমিনস্টারের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। তাঁর ভাষায়, দেশের প্রতিটি এলাকায় উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দিতে হবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা স্থানীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তিনি আগে থেকেই ঘোষিত “নং ১০ নর্থ” উদ্যোগের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। ম্যানচেস্টারভিত্তিক এই নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ বাস্তবায়নের কথা বলা হচ্ছে। বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, উদ্যোগটি ইতোমধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে, যদিও এর কার্যপদ্ধতি ও দায়িত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
বার্নহ্যাম জানান, জনগণকে আর্থিক চাপ থেকে কিছুটা স্বস্তি দিতে মঙ্গলবার থেকে নতুন পদক্ষেপ ঘোষণা করা হবে। সম্ভাব্য উদ্যোগগুলোর মধ্যে কর-সংক্রান্ত পরিবর্তন, জ্বালানি বিলের জন্য সামাজিক সহায়তা, খাদ্য ও পরিবহন ব্যয়ে সহায়তা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে বলে বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন।
তিনি আরও বলেন, এসব উদ্যোগের অর্থায়নের উৎসও সরকার স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করবে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম নির্দেশনাগুলোর একটি হবে রাস্তায় বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে গৃহহীনতা দূর করা। ভাষণে তিনি বলেন, “আমি খুব শিগগিরই আমার প্রথম নির্দেশনা দেব, যাতে আমাদের দেশে রাফ স্লিপিং বা খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানোর অবসান ঘটে।”
গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র থাকাকালে বার্নহ্যাম ২০২০ সালের মধ্যে রাফ স্লিপিং বন্ধের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৭ সালে গ্রেটার ম্যানচেস্টারে এ ধরনের মানুষের সংখ্যা ছিল ২৬৮। ২০২০ সালে তা কমে ১২৫-এ এবং ২০২১ সালে ৯০-এ নেমে এলেও ২০২৫ সালে আবার বেড়ে ১৯৭-এ পৌঁছায়।
এদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেছেন। বিদায়ী বক্তব্যে তিনি বলেন, তিনি দায়িত্ব ছাড়ছেন “সৌজন্য ও হাসিমুখে”।
স্টারমারের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়ার আগে তিনি ডাউনিং স্ট্রিটের কর্মীদের উদ্দেশে হাতে লেখা শত শত ধন্যবাদপত্র লিখেছেন। একজন সহযোগী বলেন, “তিনি সত্যিই একজন ভালো মানুষ।”
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই বিশ্বের বিভিন্ন নেতা বার্নহ্যামকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ফন ডার লেইন বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করতে তিনি বার্নহ্যামের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর করার আশা প্রকাশ করেছেন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি নতুন প্রধানমন্ত্রীর সাফল্য কামনা করে বলেছেন, “সব ধরনের সম্ভাব্য উপায়ে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।”
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বার্নহ্যামের নেতৃত্ব নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি উত্তর সাগরে তেল উত্তোলন সম্প্রসারণের সম্ভাবনাকে স্বাগত জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিরক্ষা ব্যয়, অভিবাসন নীতি, ডিজিটাল সার্ভিস কর এবং ইরান যুদ্ধ-পরবর্তী কূটনৈতিক পরিস্থিতি—এসব বিষয়ে ওয়াশিংটন নতুন সরকারের পদক্ষেপ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনি বলেছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট মোকাবিলা এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। একই সঙ্গে তিনি বার্নহ্যামের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনার আশা প্রকাশ করেন।
ওয়েলসের ফার্স্ট মিনিস্টার রুন অ্যাপ আইওয়ার্থ বলেছেন, বার্নহ্যামের নেতৃত্ব ওয়েলস ও যুক্তরাজ্য সরকারের সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার সুযোগ তৈরি করেছে।
অন্যদিকে উত্তর আয়ারল্যান্ডের রাজনৈতিক নেতারা নতুন প্রধানমন্ত্রীর কাছে অতিরিক্ত অর্থায়নের দাবি তুলতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বার্নহ্যাম তাঁর ভাষণে দেশের জন্য একটি ১০ বছরের পরিকল্পনার কথা বললেও এর বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করেননি। আগামী কয়েক সপ্তাহে তিনি অর্থনীতি, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও জনসেবাসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের অগ্রাধিকার তুলে ধরবেন বলে জানা গেছে।
ভাষণের শেষাংশে তিনি বলেন, “আমি আমার সর্বোচ্চটা দেব।” তাঁর এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে ব্রিটিশ জনগণ ও আন্তর্জাতিক মহলের।
