বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার লবণাক্ততা–প্রবণ এলাকায় নারীদের পরিচালনায় কমিউনিটিভিত্তিক পানি শোধন ও সরবরাহ উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের জন্য নিরাপদ পানির নতুন ভরসা হয়ে উঠেছে। নদী ও খালের পানি পরিশোধন করে বর্তমানে প্রায় আড়াই হাজার পরিবারের কাছে সুপেয় পানি পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এতে যেমন বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্যতা বেড়েছে, তেমনি পানিবাহিত রোগও কমতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন উপকারভোগীরা।
বঙ্গোপসাগর–সংলগ্ন পাথরঘাটা উপজেলার ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে গভীর নলকূপ থেকেও লবণাক্ত পানি ওঠে। চারদিকে নদী ও সাগর থাকলেও সেই পানি পানের উপযোগী নয়। ফলে বছরের পর বছর স্থানীয় বাসিন্দাদের সরকারি খাসপুকুর কিংবা সংরক্ষিত বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এতে দৈনন্দিন ভোগান্তির পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যও ঝুঁকির মুখে ছিল।
এই বাস্তবতায় কমিউনিটিভিত্তিক পানি সরবরাহ প্রকল্প স্থানীয় মানুষের জন্য কার্যকর সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বর্তমানে এ উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় আড়াই হাজার পরিবারের প্রায় আট হাজার মানুষ নিরাপদ পানির সুবিধা পাচ্ছেন।
২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে অক্সফাম ও এমটিবি ফাউন্ডেশনের সহায়তায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এনএসএস (নজরুল স্মৃতি সংসদ) পাথরঘাটায় ভূ-উপরিস্থ পানি পরিশোধন ও সরবরাহ প্রকল্প চালু করে। প্রকল্পের আওতায় নদী ও খালের পানি বিশুদ্ধ করে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
এ ব্যবস্থায় দুটি বড় এবং ছয়টি ছোট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিটি পরিবার দৈনিক প্রয়োজন অনুযায়ী ৫ থেকে ১০ লিটার পানি সংগ্রহ করছে। প্রতি লিটার পানির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ পয়সা।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, একটি বড় ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপনে প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা এবং ছোট প্ল্যান্টে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। বড় প্ল্যান্টে ঘণ্টায় প্রায় দেড় হাজার লিটার এবং ছোট প্ল্যান্টে ঘণ্টায় ৫০ লিটার পানি বিশুদ্ধ করা যায়। বর্তমানে প্রতিদিন সকালে দুই ঘণ্টা এবং বিকেলে দুই ঘণ্টা করে প্ল্যান্টগুলো চালু থাকে।
পানি বিক্রির অর্থ সরাসরি ব্যবস্থাপনা কমিটির ব্যাংক হিসাবে জমা হয়। বিদ্যুৎ বিল ও রক্ষণাবেক্ষণসহ প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর পর অবশিষ্ট অর্থ সুবিধাভোগী পরিবারের মধ্যে বণ্টন করা হয়।
স্থানীয়দের মতে, দেশের সবচেয়ে পানিসংকটপূর্ণ এলাকার অন্যতম পাথরঘাটা। নিরাপদ পানি সংগ্রহের সবচেয়ে বড় চাপ বহন করতে হয় নারীদের। দীর্ঘ পথ হেঁটে পানি আনা কিংবা সীমিত খাসপুকুরের ওপর নির্ভর করাই ছিল তাঁদের নিত্যদিনের বাস্তবতা।
এই প্রকল্পের বিশেষ দিক হলো, এর সার্বিক ব্যবস্থাপনা নারীরাই পরিচালনা করছেন। পানি উৎপাদন, বিতরণ, হিসাব সংরক্ষণ এবং দৈনন্দিন পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন স্থানীয় সুবিধাভোগী নারীরা।
বলেশ্বর নদসংলগ্ন গাববাড়িয়া সরকারি আবাসনসহ আশপাশের এলাকায় প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে নির্ধারিত সময়ে মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে পানি সংগ্রহ করেন। গাববাড়িয়া ছাড়াও চরদুয়ানি, তাফালবাড়িয়া, খলিফার হাট, মধ্য জ্ঞানপাড়া, দশঘর ও হোগলাপাশাসহ সাতটি গ্রামের বাসিন্দারা এই সুবিধা পাচ্ছেন।
গাববাড়িয়া আবাসনের পানি শোধনাগারের দায়িত্বে থাকা নুরজাহান বেগম জানান, আবাসনের ৫০টি পরিবারের পাশাপাশি আশপাশের ছয়টি গ্রামের প্রায় আড়াই হাজার পরিবারের জন্য প্রতিদিন দুই দফায় পানি সরবরাহ করা হয়। ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি পরিবারের তথ্য নিবন্ধন করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রকল্প চালুর পর নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা বাড়ায় পানিবাহিত রোগের প্রকোপ কমেছে।
খলিফার হাট এলাকার ফাতেমা বেগম (৩৮), তাজেনুর বেগম (৪৫) ও হনুফা বেগম (৪২) জানান, আগে শুষ্ক মৌসুমে পুকুরের নোংরা ও লবণাক্ত পানি ব্যবহার করতে হতো। ২০২৪ সালে শোধনাগার চালুর পর সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। এখন শিশুদের ডায়রিয়া, আমাশয় ও চর্মরোগের মতো সমস্যাও অনেক কমে এসেছে।
গাববাড়িয়া আবাসনের বাসিন্দা সাহেদা বেগম (৬০) বলেন, অসুস্থতার কারণে তাঁর পক্ষে দূর থেকে পানি আনা সম্ভব ছিল না। আগে খাল, নদী ও পুকুরের পানি ফুটিয়ে পান করতেন, ফলে প্রায়ই অসুস্থ থাকতে হতো। এখন আবাসনেই নিরাপদ পানি পাওয়ায় সেই সমস্যা অনেকটাই দূর হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা শারমিন আক্তার বলেন, “পানির যে কী কষ্ট, আলহে মোগো বুঝাইতে পারমু না। আগে আধা কিলোমিটার দূরের পুহুইরে (পুকুর) গোনে খাবার পানি আনা লাগত। হেই পানিও নিরাপদ আলহে না, বাচ্চাগুলার প্রায়ই ডায়রিয়া অইত। এহন আবাসনে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা অওনে মোগো কী যে আছান অইছে, বুঝাইতে পারমু না।”
এনএসএসের ওয়াশ ফ্যাসিলিটেটর ঝরনা আক্তার বলেন, সবচেয়ে পানিসংকটপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এক বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নিরাপদ পানি নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয়দের রোগবালাইও কমেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে নিরাপদ পানির সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে পাথরঘাটার এই উদ্যোগ উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার একটি কার্যকর মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এনএসএসের নির্বাহী পরিচালক শাহাবুদ্দিন পান্না বলেন, প্রকল্পটি চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। দ্বিতীয় ধাপে প্রকল্পের মেয়াদ না বাড়লে ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টগুলো সুবিধাভোগী নারীদের নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি জানান, ইতোমধ্যে নারীদের কারিগরি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং বড় ধরনের ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত টেকনিশিয়ানের সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
জাতীয় পানিসম্পদ সুরক্ষা কমিটির বরিশাল বিভাগীয় সদস্য রফিকুল আলম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানির টেকসই সমাধান কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সেই প্রশ্নের একটি বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠছে পাথরঘাটার এই প্রকল্প। তাঁর মতে, প্রযুক্তি, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং নারীর নেতৃত্বের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এ উদ্যোগ ভবিষ্যতের জন্য একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত।
