কক্সবাজারের তারকা হোটেল সী-গালের রেস্তোরাঁয় দেশি মুরগির পরিবর্তে সোনালি মুরগি পরিবেশনের অভিযোগের প্রতিকার চাইতে গিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে রেস্তোরাঁটির ম্যানেজার মীর কামরুল হাসানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় শনিবার রাতে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় দণ্ডবিধির ৪১৯, ৪২০ ও ৫০৬ ধারায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মুহাম্মদ আলী বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে পর্যটককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে পুলিশ মামলা করেছে। একই অভিযোগে অভিযুক্ত ম্যানেজারকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার বাসিন্দা মোহাম্মদ রাসেল উদ্দিন গত ৯ আগস্ট পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কক্সবাজারে যান। তিনি সী-গাল হোটেলের ৭১৫ ও ৭১৭ নম্বর কক্ষে অবস্থান করেন।
রাসেলের অভিযোগ, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে হোটেলটির রেস্তোরাঁয় খাবার খেতে গিয়ে তিনি একাধিকবার নিশ্চিত হয়ে দেশি মুরগির মাংসের অর্ডার দেন। রেস্তোরাঁর কর্মীরাও তাঁকে দেশি মুরগি পরিবেশনের কথা জানান। তবে খাবার পাওয়ার পর স্বাদ নিয়ে তাঁর সন্দেহ হয়। পরে বিষয়টি রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষকে জানালে দেশি মুরগির বদলে সোনালি মুরগি পরিবেশনের বিষয়টি স্বীকার করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
রাসেল জানান, হোটেল কর্তৃপক্ষ তাঁকে আরও জানায়, সেখানে ‘দেশি মুরগি’ হিসেবে মূলত সোনালি মুরগির মাংসই পরিবেশন করা হয়।
পরে বিষয়টি কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটকে ফোনে জানান রাসেল। তাঁর অভিযোগ, তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিকার না পেয়ে পরে হোটেলের রেস্তোরাঁ ম্যানেজার মীর কামরুল হাসানের ফোন পান। ওই ফোনে রাজনৈতিক প্রভাবের কথা উল্লেখ করে তাঁকে হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন রাসেল।
রাসেল উদ্দিন বলেন, খাবারের দাম নিয়ে তাঁর আপত্তি ছিল না। তবে দেশি মুরগি দেওয়ার কথা নিশ্চিত করার পর অন্য ধরনের মুরগির মাংস পরিবেশন এবং পরে রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে হুমকি দেওয়ার বিষয়টি তিনি মেনে নিতে পারেননি। এ ঘটনায় তিনি জাতীয় অভিযোগ সেল ও পরে সরকারের কেন্দ্রীয় অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (জিআরএস) অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অভিযোগ করেন।
এদিকে, অভিযোগের বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় মীর কামরুল হাসান হোটেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্পর্ক রয়েছে বলে দাবি করেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের হোটেলটা তারেক জিয়ার হোটেল নামে সবাই জানে।’ তাঁর এই কথোপকথনের অডিও প্রকাশের পর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অডিওটি প্রকাশের পর বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের নজরে আসে। এরপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় বলে সূত্রটি জানায়। তবে এসব দপ্তর থেকে সরাসরি এমন নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে হোটেল সী-গাল গ্রুপের চেয়ারম্যান মাসুম ইকবাল জানিয়েছেন, ঘটনার পরপরই মীর কামরুল হাসানকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা প্রতিষ্ঠানের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়েছে।
শুধু হুমকির অভিযোগে করা মামলাই নয়, খাবার পরিবেশন নিয়ে রাসেল উদ্দিনের লিখিত অভিযোগও কর্তৃপক্ষ আমলে নিয়েছে। অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক (যুগ্মসচিব) সেবাস্টিন রেমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলেও অভিযোগ করেছিলেন রাসেল। সেখানে তাৎক্ষণিক প্রতিকার না পাওয়ার পর তিনি কেন্দ্রীয় অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থায় অভিযোগ করেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযোগটি গ্রহণ করে তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে।
