এআই ও শেয়ারবাজারের উল্লম্ফনে দ্রুত বাড়ছে অতিধনীদের সম্পদ, বৈষম্য নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
বিশ্বব্যাপী অতিধনী মানুষের সংখ্যা এবং সম্পদের পরিমাণ নতুন রেকর্ড গড়েছে। সর্বশেষ এক আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, গত এক বছরে বিশ্বের বিলিয়নেয়ারের সংখ্যা ১৩ শতাংশ বেড়ে ৩ হাজার ৩০২ জনে পৌঁছেছে। একই সময়ে তাদের গড় সম্পদও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার পেছনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের প্রসার এবং বৈশ্বিক শেয়ারবাজারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউবিএসের গবেষণার বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সম্পদের কেন্দ্রীকরণ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুততর হচ্ছে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের সম্পদ বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
গবেষণায় দেখা গেছে, গত এপ্রিল পর্যন্ত এক বছরের ব্যবধানে বিলিয়নেয়ারদের গড় সম্পদ প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে বিশ্বের সাধারণ জনগণের গড় ব্যক্তিগত সম্পদ বেড়েছে মাত্র ১০ দশমিক ৮ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ব্যবধান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বৈশ্বিক সম্পদ বণ্টনে অসমতা আরও প্রকট হচ্ছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, এআই এবং পুঁজিবাজারভিত্তিক বিনিয়োগ থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছেন বিশ্বের শীর্ষ ধনীরা।
গবেষণা অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের ১৯ জন ব্যক্তির সম্পদের পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এছাড়া আরও ১৮ জনের সম্পদ ৫০ থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে রয়েছে।
এই অতিধনীদের বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক। বিশ্বের শীর্ষ ধনকুবেরদের তালিকায় প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের আধিপত্যও ক্রমশ বাড়ছে।
ইউবিএসের অর্থনীতিবিদ জেমস মাজেউর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ায় প্রযুক্তি খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারের মূল্য দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিলিয়নেয়ারদের সম্পদের বড় অংশ যেহেতু শেয়ার ও করপোরেট মালিকানার সঙ্গে যুক্ত, তাই বাজারের এই উত্থান সরাসরি তাদের সম্পদ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুত বিশ্বব্যাপী সম্প্রসারণের সুযোগ পাচ্ছে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল সম্পদ গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে।
আবাসন ও সম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাইট ফ্রাঙ্কের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩১ সালের মধ্যে বিশ্বের বিলিয়নেয়ারের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজারে পৌঁছাতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে বিশ্বের বিলিয়নেয়ারের সংখ্যা দাঁড়াতে পারে প্রায় ৩ হাজার ৯১৫ জনে।
একই সঙ্গে মাল্টিমিলিয়নেয়ারদের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে অন্তত ৩ কোটি ডলার বা তার বেশি সম্পদের মালিক মানুষের সংখ্যা কয়েক বছরের ব্যবধানে কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
নতুন মিলিয়নেয়ার তৈরির ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে রয়েছে। গত এক বছরে দেশটিতে ৪ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ প্রথমবারের মতো মিলিয়নেয়ারের তালিকায় যুক্ত হয়েছেন।
বিশ্বব্যাপী নতুন মিলিয়নেয়ার বৃদ্ধির প্রায় অর্ধেকই এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এছাড়া যুক্তরাজ্যেও কয়েক হাজার নতুন মিলিয়নেয়ার যুক্ত হয়েছে।
সম্পদ বৃদ্ধির ইতিবাচক দিক থাকলেও অর্থনীতিবিদ ও সামাজিক বিশ্লেষকরা বৈষম্য বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
বৈশ্বিক বৈষম্যবিষয়ক বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বের অতি ক্ষুদ্র একটি জনগোষ্ঠীর হাতে বিপুল সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, অর্থনৈতিক শক্তির পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবও ক্রমে এই গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।
এতে সমাজে আয়বৈষম্য, সুযোগের অসমতা এবং সামাজিক চাপ বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন Elon Musk। প্রযুক্তি ও মহাকাশ খাতে বিনিয়োগের সাফল্যের কারণে তার সম্পদ গত এক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিশেষ করে মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি খাতের সম্প্রসারণ তার সম্পদ বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছে। শীর্ষ ধনীদের তালিকায় আরও রয়েছেন Larry Page এবং Sergey Brin।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগ এবং পুঁজিবাজারের সম্প্রসারণ বিশ্বজুড়ে সম্পদ সৃষ্টির নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। তবে একই সঙ্গে ধনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সম্পদের ব্যবধানও বাড়ছে। ফলে আগামী বছরগুলোতে শুধু সম্পদ বৃদ্ধিই নয়, বৈষম্য নিয়ন্ত্রণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বৈশ্বিক নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
