প্রাণহানি ১,৪৩০ ছাড়িয়েছে; স্বজন হারানোর বেদনা আর সীমিত সরকারি সাড়ায় হতাশ দুর্গতরা
ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পের আঘাতে বিপর্যস্ত ভেনেজুয়েলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৪৩০-এ পৌঁছেছে। ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর রাজধানী কারাকাসের প্রধান মর্গগুলোতে মরদেহের চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সময়ে নিখোঁজ হাজারো মানুষের খোঁজে স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষা এবং সরকারি উদ্ধার তৎপরতার গতি নিয়ে জনমনে অসন্তোষও বাড়ছে।
গত সপ্তাহে দেশটির ক্যারিবীয় উপকূলীয় অঞ্চলে পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানলে শত শত ভবন ধসে পড়ে এবং বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েন। এর প্রভাব রাজধানী কারাকাসসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
কারাকাসের বেলো মন্টে মর্গে প্রতিদিনই নিহতদের মরদেহ নিয়ে আসছেন স্বজন ও উদ্ধারকর্মীরা। মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা পিকআপ ভ্যানে করেও অনেক মরদেহ সেখানে আনা হচ্ছে।
স্বেচ্ছাসেবীরা জানিয়েছেন, শোকাহত পরিবারগুলোর মানসিক সহায়তার জন্য তারা দিন-রাত কাজ করছেন। মর্গের বাইরে অপেক্ষমাণ স্বজনদের অনেকেই এখনও নিখোঁজ পরিবারের সদস্যদের খোঁজে উদ্বিগ্ন।
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত একটি আবাসিক ভবন ধসে পরিবারের তিন সদস্যকে হারানো এক নারী জানান, তার ভাইয়ের মরদেহ শনাক্ত করা গেলেও বাবা-মা এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার উপকূলীয় অঞ্চল লা গুইরা ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু বহুতল ভবন সম্পূর্ণ বা আংশিক ধসে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উদ্ধারকাজ শুরু হতে দেরি হওয়ায় অনেক আহত ব্যক্তি সময়মতো চিকিৎসা পাননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুয়া সুনামি সতর্কবার্তাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে স্বেচ্ছাসেবক, মানবিক সংগঠন এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্গতদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে।
জাতীয় পর্যায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, শত শত কফিন, মরদেহ সংরক্ষণের ব্যাগ এবং অন্যান্য জরুরি সামগ্রী বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ নিজ উদ্যোগে মরদেহ পরিবহন এবং উদ্ধার কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন।
ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও জীবিত মানুষ থাকার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কয়েক ডজন মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
এর মধ্যে উপকূলীয় কারাবালেদা এলাকায় ১১ বছর বয়সী এক শিশুকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা দেশজুড়ে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। উদ্ধারকর্মীরা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
সরকারি কর্তৃপক্ষ উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কথা জানালেও অনেক ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকের অভিযোগ, দুর্যোগের প্রথম কয়েক ঘণ্টায় তারা পর্যাপ্ত সহায়তা পাননি।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা দ্রুত ত্রাণ ও পুনর্বাসন ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং জরুরি সেবাখাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব পরিস্থিতি মোকাবিলাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
আফটারশকের আশঙ্কা এবং ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে কারাকাসের বিভিন্ন এলাকায় শত শত পরিবার খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছে। অনেকেই তাঁবু, অস্থায়ী আশ্রয় কিংবা রাস্তার পাশে রাত কাটাচ্ছেন।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা সহায়তা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ভূমিকম্প শুধু ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতিই ডেকে আনেনি, বরং দেশটির দুর্যোগ মোকাবিলা সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও সামনে এনেছে। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকলেও হাজারো পরিবার এখনও নিখোঁজ স্বজনদের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছে। পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের দীর্ঘ পথ এখন দেশটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
