যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় নগদের তীব্র সংকট, ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ব্যাপক বেকারত্ব মানুষের আর্থিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের সঞ্চয় ধরে রাখতে অনেক ফিলিস্তিনি এখন সোনার দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু কেন সোনাই হয়ে উঠছে তাদের শেষ ভরসা?
ইসরায়েলি অবরোধ ও যুদ্ধের কারণে গাজায় নগদ অর্থের সরবরাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ব্যাংকিং পরিষেবাও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে শুধু দৈনন্দিন খরচ চালানোই কঠিন হয়ে পড়েনি, সঞ্চয় নিরাপদে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
নগদ অর্থের বদলে কেন সোনা?
গাজায় অনেক মানুষের কাছে নগদ অর্থ ধরে রাখার চেয়ে সোনা এখন তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ ব্যাংক সবসময় স্বাভাবিকভাবে কার্যক্রম চালাতে পারছে না এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকিং লেনদেনও সীমিত।
গাজা শহরের বাসিন্দা রামা হুসেইন বলেন, নিজের অর্থ নিরাপদে সংরক্ষণের জন্য তিনি সোনা কিনছেন। তাঁর মতে, নগদ অর্থ সবসময় সহজলভ্য নয়। অন্যদিকে সোনা বিশ্ববাজারে স্বীকৃত একটি সম্পদ এবং প্রয়োজন হলে তা বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব।
অর্থাৎ ব্যাংক ও নগদ অর্থের ওপর আস্থা কমে যাওয়ার পরিস্থিতিতে সোনা অনেকের কাছে সম্পদ ধরে রাখার বিকল্প হয়ে উঠেছে।
সোনা কেন গাজাবাসীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ?
সোনার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল নয়। একজন ব্যক্তি নিজের কাছে সোনা সংরক্ষণ করতে পারেন এবং প্রয়োজনের সময় তা বিক্রি করে নগদ অর্থ সংগ্রহ করতে পারেন।
যুদ্ধের মতো চরম অনিশ্চয়তার সময়ে এই বৈশিষ্ট্যই সোনাকে আকর্ষণীয় করে তুলছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সোনা সবার জন্য সহজলভ্য। বরং দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের পক্ষে সোনা কেনাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়েও গাজায় বেশি সোনার দাম
গাজার একজন স্বর্ণ ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আল-আশকার জানান, যুদ্ধের শুরুতে গাজায় প্রতি গ্রাম সোনার দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কম ছিল।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। গাজার বাজারে সোনার দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বেশি। চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি সরবরাহ সংকটও এর অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
আল-আশকারের আশা, সীমান্তপথগুলো খুলে দেওয়া হলে গাজায় সোনার সরবরাহ বাড়বে এবং স্থানীয় দাম আন্তর্জাতিক বাজারের কাছাকাছি চলে আসতে পারে।
গাজায় নতুন করে ঢুকছে না সোনা
গাজার গোল্ড ট্রেডার্স সিন্ডিকেটের প্রধান আবু আলা হাবুব জানিয়েছেন, যুদ্ধের আগে পশ্চিম তীর, মিসর ও দুবাইসহ বিভিন্ন স্থান থেকে গাজায় সোনা আসত।
সীমান্তপথ খোলা থাকায় নির্ধারিত আইনি চ্যানেলের মাধ্যমে সোনা গাজায় প্রবেশ করতে পারত। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে।
হাবুবের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে চলা যুদ্ধ ও অবরোধের কারণে বর্তমানে গাজায় নতুন করে সোনা প্রবেশ করছে না।
ফলে বাজারে তৈরি হয়েছে একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি চাহিদা বাড়ছে, অথচ সরবরাহ কমছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সোনার দামে।
কেউ কিনছেন সোনা, কেউ বিক্রি করছেন খাবারের জন্য
তবে গাজার সব পরিবার সোনা কিনছে না। যুদ্ধের কারণে আয় কমে যাওয়া এবং সঞ্চয় শেষ হয়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার নিজেদের কাছে থাকা সোনা বিক্রি করে খাবার ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনীয় পণ্য কিনছে।
অর্থাৎ সোনা একই সঙ্গে দুই ধরনের ভূমিকা পালন করছে।
একদিকে এটি কারও কাছে সঞ্চয় রক্ষার মাধ্যম, অন্যদিকে সংকটের সময়ে এটি জরুরি অর্থ সংগ্রহের সম্পদ।
যে পরিবারগুলোর হাতে আগে থেকেই সোনা রয়েছে, তাদের জন্য এটি কঠিন সময়ে টিকে থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
গাজায় মূল্যস্ফীতি পৌঁছেছিল ২৩০ শতাংশে
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে গাজায় মূল্যস্ফীতি ২৩০ শতাংশে পৌঁছেছিল। একই সময়ে ২০২৪ সালের শেষদিকে গাজার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ বেকার ছিল বলে বিশ্বব্যাংকের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থের ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত কমে যায়। ফলে মূল্য ধরে রাখতে পারে—এমন সম্পদের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়া স্বাভাবিক।
সোনার ক্ষেত্রে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
গাজায় দৈনন্দিন অধিকাংশ লেনদেনে ইসরায়েলি মুদ্রা শেকেল ব্যবহার করা হয়। কিন্তু নগদের সংকট এবং ব্যাংকিং পরিষেবার সীমাবদ্ধতা মানুষের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে কঠিন করে তুলেছে।
ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক মানুষ প্রচলিত আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে সম্পদ সংরক্ষণের পথ খুঁজছেন। সেই জায়গাতেই সোনার গুরুত্ব বাড়ছে।
বিশ্ববাজারেও সোনার দাম বাড়ছে
শুধু গাজার বাজারেই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও সাম্প্রতিক সময়ে সোনার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
জানুয়ারির শেষদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৫,৬০০ ডলারের বেশি উঠে সর্বকালীন রেকর্ড তৈরি করেছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার সঙ্গে গাজার স্থানীয় সরবরাহ সংকট যুক্ত হওয়ায় সেখানে সোনার দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাহলে কেন সোনাই শেষ ভরসা?
গাজাবাসীর কাছে সোনা এখন শুধু বিনিয়োগের মাধ্যম নয়। এটি যুদ্ধকালীন অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রতীকও।
যেখানে ব্যাংকিং ব্যবস্থা অচল, নগদ অর্থের সরবরাহ সীমিত, মূল্যস্ফীতি তীব্র এবং কর্মসংস্থান ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত—সেখানে মানুষ এমন সম্পদ খুঁজছেন, যা নিজের কাছে রাখা যায় এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব।
এই কারণেই অনেকের কাছে নগদের চেয়ে সোনা, ব্যাংকের চেয়ে হাতে থাকা সম্পদ এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে সোনা হয়ে উঠছে শেষ ভরসা।
তবে এর আরেকটি কঠিন দিকও রয়েছে। সোনার দাম যত বাড়ছে, সাধারণ মানুষের জন্য তা কেনা তত কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে সোনা একদিকে নিরাপত্তার প্রতীক হলেও অন্যদিকে এটি গাজার অর্থনৈতিক বৈষম্যের একটি নতুন চিত্রও তুলে ধরছে।
আপনার মতামত কী?
যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে সোনা কি সত্যিই মানুষের সঞ্চয় রক্ষার নিরাপদ মাধ্যম হতে পারে? নাকি গাজার মতো পরিস্থিতিতে সোনার দামও শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে?
