কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম আলোচিত প্রযুক্তি। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যাংকিং, সাংবাদিকতা, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ প্রায় প্রতিটি খাতেই এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। মানুষের মতো তথ্য বিশ্লেষণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ভাষা বোঝা এবং নতুন কনটেন্ট তৈরির সক্ষমতার কারণে প্রযুক্তির এই শাখাটি নতুন এক যুগের সূচনা করেছে। তবে আজকের এই বিপ্লবী প্রযুক্তির পেছনে রয়েছেন একজন দূরদর্শী বিজ্ঞানী— জন ম্যাকার্থি। প্রযুক্তি বিশ্বের ইতিহাসে তাঁকেই ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জনক’ বা ফাদার অব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বলা হয়।
কে ছিলেন জন ম্যাকার্থি?
জন ম্যাকার্থি ছিলেন একজন মার্কিন কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও জ্ঞানতাত্ত্বিক গবেষক। তিনি ১৯২৭ সালের ৪ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের বোস্টনে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। পরবর্তীতে তিনি ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানের গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন।
বিশ্ব যখন কম্পিউটার প্রযুক্তির প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল, তখনই জন ম্যাকার্থি এমন একটি ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেন, যেখানে যন্ত্র মানুষের মতো চিন্তা করতে, শিখতে এবং সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হবে। তাঁর এই গবেষণাই পরবর্তীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নামে পরিচিত একটি নতুন বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রের জন্ম দেয়।
‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ শব্দটির জন্ম
১৯৫৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ার অঙ্গরাজ্যের ডার্টমাউথ কলেজে অনুষ্ঠিত ডার্টমাউথ সামার রিসার্চ প্রজেক্ট অন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নামের একটি ঐতিহাসিক গবেষণা সম্মেলনের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন জন ম্যাকার্থি। এই সম্মেলনেই প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে “আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স” বা “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা” শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
প্রযুক্তি ইতিহাসবিদদের মতে, এই সম্মেলনই আধুনিক এআই গবেষণার আনুষ্ঠানিক সূচনা। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে পরবর্তীতে এআই নিয়ে যে ব্যাপক গবেষণা শুরু হয়, তার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল এই আয়োজনের মাধ্যমে।
লিস্প: এআই গবেষণার পথপ্রদর্শক প্রোগ্রামিং ভাষা
জন ম্যাকার্থির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো লিস্প (LISP) নামের একটি প্রোগ্রামিং ভাষা তৈরি করা। ১৯৫৮ সালে উদ্ভাবিত এই ভাষাটি দীর্ঘদিন ধরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণার সবচেয়ে জনপ্রিয় ও কার্যকর প্রোগ্রামিং ভাষাগুলোর একটি ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক এআই গবেষণার অনেক মৌলিক ধারণা ও অ্যালগরিদম প্রথমে লিস্প ভাষার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছিল। ফলে জন ম্যাকার্থির অবদান শুধু একটি ধারণা প্রবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ভিত্তিও তৈরি করেছিলেন।
অ্যালান টুরিংয়ের অবদান
যদিও জন ম্যাকার্থিকে এআই-এর জনক বলা হয়, তবুও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশে আরও অনেক বিজ্ঞানীর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন ব্রিটিশ গণিতবিদ ও কম্পিউটার বিজ্ঞানী অ্যালান টুরিং।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির এনিগমা কোড ভাঙার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। ১৯৫০ সালে প্রকাশিত তাঁর গবেষণাপত্র “কম্পিউটিং মেশিনারি অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স”-এ তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন— “যন্ত্র কি চিন্তা করতে পারে?”
এই গবেষণার অংশ হিসেবেই তিনি টুরিং টেস্ট নামে একটি পরীক্ষার ধারণা দেন। কোনো যন্ত্র মানুষের মতো বুদ্ধিমত্তা প্রদর্শন করতে পারে কি না, তা মূল্যায়নের জন্য আজও টুরিং টেস্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়।
আধুনিক এআই কোথায় পৌঁছেছে?
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ নেই। চ্যাটবট, ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট, স্বয়ংক্রিয় অনুবাদ, ছবি ও ভিডিও শনাক্তকরণ, স্বচালিত যানবাহন, চিকিৎসা নির্ণয় এবং জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তিতে এর ব্যাপক ব্যবহার দেখা যাচ্ছে।
বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন উন্নত ভাষা মডেল, রোবটিক্স এবং স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। ফলে এআই ভবিষ্যতের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইতিহাসে অমর এক নাম
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপ্লব কোনো একদিনে তৈরি হয়নি। এটি কয়েক দশকের গবেষণা, উদ্ভাবন এবং বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টার ফল। তবে এই দীর্ঘ যাত্রার সূচনায় যে মানুষটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তিনি জন ম্যাকার্থি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শব্দটির প্রবর্তন, গবেষণার ভিত্তি নির্মাণ এবং নতুন প্রোগ্রামিং ধারণা বিকাশের মাধ্যমে তিনি প্রযুক্তি ইতিহাসে স্থায়ী স্থান করে নিয়েছেন। এ কারণেই বিশ্বজুড়ে তিনি আজও ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জনক’ হিসেবে সম্মানিত।
