গর্ভাবস্থায় বিশেষ প্রয়োজনেই অনেক নারীকে উড়োজাহাজে ভ্রমণ করতে হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মা ও গর্ভস্থ শিশুর কোনো জটিলতা না থাকলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিমান ভ্রমণ সাধারণত নিরাপদ। তবে কিছু শারীরিক অবস্থা ও গর্ভকালীন জটিলতায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ভ্রমণ করা উচিত নয়।
কর্মক্ষেত্র, পারিবারিক প্রয়োজন বা দূরপাল্লার যাতায়াতের কারণে অনেক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে বিমানে ভ্রমণ করতে হয়। তবে এই সময় বিমানযাত্রা কতটা নিরাপদ—এ প্রশ্ন অনেকেরই থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকিমুক্ত গর্ভাবস্থায় নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিমান ভ্রমণ সাধারণত নিরাপদ হলেও কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারজানা শারমিন জানান, মা ও গর্ভস্থ শিশুর কোনো জটিলতা না থাকলে উড়োজাহাজে ভ্রমণ সাধারণত নিরাপদ। বর্তমান বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুযায়ী, বিমান ভ্রমণের কারণে সময়ের আগে প্রসব, পানি ভেঙে যাওয়া বা প্লাসেন্টা (গর্ভফুল) আলাদা হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তবে তিনি বলেন, গর্ভাবস্থার ৩৭ সপ্তাহের পর বিমান ভ্রমণ এড়িয়ে চলা উচিত। আর যমজ সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে ৩২ সপ্তাহের পর উড়োজাহাজে না ওঠাই নিরাপদ।
উড়োজাহাজের কেবিনে বায়ুচাপ ও আর্দ্রতা তুলনামূলক কম থাকায় ভ্রমণের সময় কিছু শারীরিক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। মুখ ও নাক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, কানে চাপ অনুভব করা, কান বন্ধ হয়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা, বমি ভাব কিংবা পা ফুলে যাওয়ার মতো সমস্যা অনেকেরই হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকিমুক্ত গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এসব পরিবর্তন সাধারণত গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করে না। তবে যাঁদের গর্ভাবস্থা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ, তাঁদের ক্ষেত্রে এসব উপসর্গ জটিলতার কারণ হতে পারে।
গর্ভাবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই রক্তের ঘনত্ব কিছুটা বেড়ে যায়, যাকে হাইপারভিসকোসিটি বলা হয়। চার ঘণ্টার বেশি সময়ের বিমান ভ্রমণে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
এই ঝুঁকি কমাতে প্রতি ৩০ মিনিট পরপর পা নাড়ানো, হাঁটু ভাঁজ করে ব্যায়াম করা, সুযোগ থাকলে কেবিনে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করা, পর্যাপ্ত পানি পান এবং ঢিলেঢালা পোশাক পরার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
দীর্ঘ ভ্রমণের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কম্প্রেশন স্টকিংস ব্যবহার করা যেতে পারে। আর যাঁদের ভেনাস থ্রম্বোএমবলিজম (ভিটিই), ডিপ ভেইন থ্রম্বসিস (ডিভিটি) বা থ্রম্বোফিলিয়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে, তাঁদের চিকিৎসকের পরামর্শে লো মলিকুলার ওয়েট হেপারিন-এর মতো রক্ত পাতলাকারী ওষুধ ব্যবহার করা প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গুরুতর রক্তস্বল্পতা (হিমোগ্লোবিন প্রতি ডেসিলিটারে ৭ দশমিক ৫ গ্রামের কম), সাম্প্রতিক রক্তক্ষরণ, গুরুতর হৃদ্রোগ, সিকল সেল ক্রাইসিস, তীব্র শ্বাসকষ্টজনিত রোগ, কানের বা সাইনাসের গুরুতর সংক্রমণ, প্লাস্টারসহ ভাঙা পা এবং অতিরিক্ত পা ফোলা থাকলে বিমান ভ্রমণ না করাই ভালো।
এ ছাড়া অকালপ্রসবের ঝুঁকি, আগেভাগে পানি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা, গুরুতর প্রি-একলাম্পসিয়া, প্লাসেন্টা প্রিভিয়া থেকে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি, জটিল যমজ গর্ভাবস্থা কিংবা গর্ভের শিশুর ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় কম থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া উড়োজাহাজে ভ্রমণ করা উচিত নয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গর্ভাবস্থায় ভ্রমণের আগে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করলে সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়ন করা সহজ হয় এবং নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করা সম্ভব।
